নিজের পরণের লুঙ্গি ঠিক রেখে তারপর অন্যদের কথা ভাবুন
![]() |
ম্যাপ |
চীন থেকে ১৬০ কিলোমিটার ও বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরত্বের চিকেন নেক ভারতের জন্য ভৌগলিকভাবে একটি অস্বস্তিকর অবস্থান। ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই করিডোর ভারতের লাইফ লাইন হিসেবে বিবেচিত। এই করিডোর হাত ছাড়া হয়ে গেলে উত্তর পূর্ব ভারতের প্রায় সাতটি রাজ্যর সাথে ভারতের সড়ক ও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এসবকে কেন্দ্র করে চীন চাচ্ছে ভারতকে বিভক্ত করতে আর ভারত ওই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্বিগুণ করেছে।
চীনের তিব্বতের চুম্বি উপত্যকা থেকে এই করিডোরের দূরত্ব হচ্ছে ১৩০ মাইল। এই দূরত্বের মাঝে ভূটান অবস্থিত। ভূটান ও নেপাল দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ায় এরা চীন ও ভারতের মাঝে দেয়াল তুলে দিয়েছে, যাতে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে ভারত। ভারতের চিকেন নেক দখল করার যে স্বপ্ন চীন দেখে তা দখল করা যে সহজ নয় তা চীনারা তা ৬২ বছর আগেই বুঝে গেছে।
১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ত্রিপুরা একটি স্বাধীন রাজ্য ছিলো। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে এই বিশাল অংশ প্রায় দুই হাজার বছর ধরে শাসন করেছে ত্রিপুরা রাজারা। ১৯৫০ সালের ১৫ ই আগষ্ট ত্রিপুরা স্বাধীন হয়ে ভারতের সাথে যুক্ত হয়। এছাড়া মেঘালয়, মণিপুর, আসাম ও অরুণাচল এসব রাজ্য ধীরে ধীরে ভারতের সাথে যুক্ত হয়।
ভারত থেকে আফগানিস্তান, বার্মা, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভূটান ও পাকিস্তান ভাগ হয়ে গেছে। পরবর্তীতে পাকিস্তান ভাগ হয়ে বাংলাদেশ হয়েছে। ভারতের ইতিহাসে ভারত কখনোই জোর করে কোন রাজ্যের দখল নেয়নি। এমনকি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র নেপাল ও ভূটানকে কখনোই জোর করে তাদের অঙ্গরাজ্যে বানায়নি। চীন, আমেরিকা ও গ্রেট ব্রিটেনের মত এই রাজনীতি ভারতীয়দের মধ্যে নেই।।
বাংলাদেশকে ভারত জোর করে দখল করবে এসব পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। ভারত যদি চাইতো তবে ১৯৬৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধের সময় যখন পাকিস্তানের বাংলাদেশ ভূখণ্ড সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিলো তখনই পুরো বাংলাদেশ দখল করে নিতে পারতো।
পাকিসস্তানপন্থী একদল বাংলাদেশীদের মধ্যে ১৯৪৭ সাল থেকেই ভারত ফোবিয়া কাজ করছে। এজন্য ঘুমের মধ্যে এদের আইফেল টাওয়ার ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙ্গে দেখে এরা স্বাধীন ছিল এবং স্বাধীন আছে কিন্তু তাদের পরনের লুঙ্গি হারিয়ে গেছে।
চিকেন নেক পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর শিলিগুড়ি ও দার্জিলিং এর ৬২% এবং জলপাইগুড়ির ৩৮% অংশ নিয়ে গঠিত। ভারতের ২৮ টি প্রদেশের মধ্যে আটটি প্রদেশ যথাক্রমে পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, আসাম , মিজোরাম, অরুণাচল, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, মেঘালয় এই করিডোরের অন্তর্ভূক্ত। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ নেপাল ও ভূটানের সাথে ট্রানজিটের জন্য এই করিডোর দিয়ে ট্রানজিট চাচ্ছে ভারতের কাছে।
জাতিগত বিদ্বেষ ও ধর্মীয় বিদ্বেষের জন্য এসব অঞ্চলে প্রায় সংঘাত লেগে আছে। অন্যদিকে চীন দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অরুণাচল প্রদেশকে দক্ষিণ তিব্বতের অংশ হিসেবে প্রচার করে নিজেদের দাবি করে আসছে। এই অঞ্চলটি দেখতে অনেকটা মুরগির ঘাড়ের মত হওয়ায় এই অঞ্চলটির নাম হয়েছে 'চিকেন নেক'।
ভারতের এই দূর্বলতাকে অনেকেই অ্যাকিলিস হিলের সাথে তুলনা করে থাকেন। ইলিয়াড়ের মহাবীর অ্যাকিলিসের দূর্বলতা ছিল তার গোড়ালি। ফলে ট্রোজান যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে রাজপুত্র প্যারিসের তীর যখন অ্যাকিলিসের গোড়ালিতে আঘাত হানে তখন অ্যাকিলিস নিহত হন।
ভারত নামক রাষ্ট্রের দূর্বলতা হচ্ছে চিকেন নেক। এই অঞ্চলটি রক্ষার জন্য এখানে ভারতের পাঁচটি বিমান ঘাটি আছে। পুরো অঞ্চল ঘিরে আছে দূর্ভেদ্য নিরাপত্তা প্রাচীর। চাইলেই যে কেউ এই অঞ্চলটি দখল করে নিবে এটা ঠাকুরমার ঝুলির মত সহজ কোন গল্প নয়।
১৯৬৫ সালে বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের অংশ ছিলো তখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ভয়াবহ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। সেইদিন পাকিস্তান তার বাংলাদেশ অংশকে অনিরাপদ রেখে সকল সৈন্যকে পাকিস্তানে নিয়ে গিয়েও তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। তখন ইচ্ছে করলেই চীন পাকিস্তানকে দিয়ে তার বাংলাদেশ ভূখন্ড ব্যাবহার করে চিকেন নেক দখল করতে পারতো। বিষয়টি যত সহজ ভাবছেন আসলে তত সহজ নয়।
ভারতের যেমন অ্যাকিলিস হিল দূর্বলতা আছে ঠিক তেমনি চীনের দূর্বলতা হচ্ছে অরুণাচল। সেখানকার পাহাড় থেকে চীনের ভূমিতে তাদের সৈন্যদের পিঁপড়ার মত দেখায়। ভারতের দূর্বলতা যেমন পাকিস্তান ঠিক তেমনি চীনের দূর্বলতা হচ্ছে জাপান, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ান।তাছাড়া চীনের তীব্বত অঞ্চলের যে স্বাধীনতার লড়াই তার নায়ক দালাইলামার অবস্থান হচ্ছে ভারতে।
এই দেশের লোটা বিজ্ঞানীরা ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষে আইফেল টাওয়ার খাড়া করেই ঘুম ভেঙ্গে দেখে তাদের পরণের লুঙ্গি নাই। যারা সবসময় অন্যের ক্ষতির দোয়া করতে থাকে দূর্ভাগ্য তাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে। বাংলাদেশের ঘাড়ের উপর এই বিষাক্ত নিঃশ্বাস হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ এই মায়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলা করতে করতেই ভারতের নাম ভূলে যাবে।।।
"বাংলাদেশেরও একটি চিকেন নেক আছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীরা "শান্তিবাহিনী" নামে অশান্তি সৃষ্টিকারী এক বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহী বাহিনী গড়ে তোলে। ভারত থেকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সাহায্য নিয়ে তারা "জুমল্যান্ড" নামে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। শেখ হাসিনা প্রথম দফায় ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালে তাদের সাথে একটি শান্তিচুক্তি হয়। তারপর থেকে পার্বত্য অঞ্চলে অনেকাংশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। আবার তারা অন্য নামে সংঘঠিত হয়ে সে চেষ্টা যে চালাবে না তার নিশ্চয়তা কি?
তা যদি হয়, বর্তমান ইউনূস সরকার ও তার মদদপুষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী যেভাবে ভারতের নামে বিষোদগার করে চলেছে তাতে বাংলাদেশের চিকেন নেক নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়তে হতে পারে। ইতোমধ্যে করিডোরের আলাপ আলোচনা শুরু হয়েও গেছে।"
প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক যেমন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পারে ঠিক তেমনি প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক খারাপ হলে একটি স্বাধীন জাতির অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে যেতে পারে। তাই 'নিজের পরণের লুঙ্গি ঠিক রেখে তারপর অন্যদের কথা ভাবুন'।
- ওমর ফারুখ শুভ (লুসিড ড্রিম )